প্রতিভা

প্রতিভা

প্রতিভা

শাহরিয়ার আলম মালিক রাফিন, চুয়াডাঙ্গা

তখনো সূর্য ওঠেনি, সবেমাত্র পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তার সাথেই পাওয়া যাচ্ছে আঁতুর ঘর থেকে ভেসে আসা এক নবজাতকের কান্নার আওয়াজ।
ঠিক তখনই ঘরের সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকছে শিশুটির বাবা।তবে একজন সাধারণ বাবার অবস্থায় ঢুকলনা কিন্তু সে, ঢুকলো নেশাগ্রস্থ অবস্থায়। ঘুমন্ত শিশুটি নাকি মেয়ে হয়ে জন্মিয়েছে;শুনেই হাতে থাকা কাঁচের বোতলটি নিচে ফেলে দিল শিশুটির বাবা।বেরিয়ে গেল সেই একই দরজা দিয়ে।সেদিন মাটিতে পড়ে থাকা কাঁচগুলোও সাক্ষী ছিল যে মেয়েটি চিরকাল তার বাবার কাছে অবহেলিত থাকবে।
বাবার কাছে অবহেলিত মেয়েটি দেখতে দেখতে জীবনের ১১ টি বছর কাটিয়ে দিল। পিতৃ স্নেহ -ভালোবাসা না পেলেও মেয়েটির মা তাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসত। মেয়ের নাম রেখেছিল তিতির।মা তাকে পড়াতো, নাচ শেখাতো, দাবা খেলা শেখাতো, চুল বেধে দিত।মা আর মেয়ে যেন ছিল একে অপরের পৃথিবী। ছোট্ট তিতিরের স্বপ্ন ছিল মাকে সে অনেক দূরে নিয়ে যাবে। তিতির পড়া-শোনায় যেমন ভাল ছিল তেমনি ভালো ছিল দাবা খেলাতে। ৫ম শ্রেনীতেও পেল বৃত্তি।
রোজ রাতে নেশাগ্রস্থ বাবার কাছে মাকে মার খেতে দেখে খুব কষ্ট পেত ছোট্ট তিতির,মুখ বুজে কাঁদত সে।ভাবতো হয়তো তারই জন্য মা মার খাচ্ছে।
একদিন ভোরবেলা, চারিদিকে কোন আওয়াজ নেই শুধু পাওয়া যাচ্ছে সেই ছোট্ট পাখিগুলোর আওয়াজ,চোখ মুছতে মুছতে ছোট্ট তিতির ডাকতে লাগলো মাকে। অনেকবার ডেকেও মায়ের ঘুম ভাঙছে না। কান্নার আওয়াজ শুনে আশেপাশের বাড়ির অনেকে ছুটে এলো। এসে দেখলো নিথর মায়ের লাশের পাশে বসে কাঁদছে ছোট্ট তিতির। মাঝে তাকে ছেড়ে চলে গেছে আর আসবেনা।
ছোট্ট তিতির রোজ একা একা চুল বেঁধে স্কুলে যায়, একা একা পড়াশোনা করে, একা একা খাই তবে সে আর দাবা খেলেনা কারণ তার দাবা খেলার সাথী যে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এভাবেই দিন কাটতে থাকে তার।
একদিন তিতির যখন মায়ের ছবির পাশে মুখ বুজে বসে ছিল তখন তার বাবা আরেকজনকে নিয়ে আসে বিয়ে করে। এতে তিতির অতটা কষ্ট পায়নি, ভেবেছিল হয়তো তার আর একটি সাথী এলো। দিন যেতে যেতে সে বুঝতে পারলো তার কষ্ট আরো বেড়ে যাচ্ছে। সৎ মা তাকে সারাদিন কাজ করার, স্কুলে যেতে দেয় না, খেতে দেয় না, মার-ধর করে ।
কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিতির বৃত্তি নিয়ে চলে যায় শহরের একটি আবাসিক স্কুলে। দেখতে দেখতে দিন কেটে যায় তিতির ভর্তি হয় কলেজে এরপর বিশ্ববিদ্যালয় তারপর শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে কম্পিউটার বিষয় নিয়ে পড়তে চলে যাই বিদেশে।শিক্ষা জীবনেই তিতর শপথ নেয়ছিল সে তার নিজের মত অসহায় মেয়েদেরকে সাহায্য করবে। তবে সাহায্য করার জন্য তার প্রয়োজন অর্থ। সে চাইলে নিজের প্রতিভার মাধ্যমেও কিন্তু এই অর্থ উপার্জন করতে পারত। তবে সে তা করেনি কারণ পৃথিবীর মানুষের উপর তার ছিল অনেক ঘৃণা। ঘৃণার কারণেই সে এই অর্থ উপার্জনের জন্য বেছে নিয়েছিল এক অন্ধকার পথ -বেছে নিয়েছিল সাইবার ক্রাইমের পথ।
সেই অবহেলিত ছোট্ট তিতির আজ হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় সাইবার ক্রিমিনাল। তবে সে এই টাকা খরচ করেছে তার মত অসহায় মেয়েদের জন্য। আজ তাকে থাকতে হয় কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে। তার এই জীবনের জন্য সে অনুসূচনা করে তবে একজন মেয়ে হিসেবে সে গর্বিত বোধ করে। তার জন্যই বেঁচে থাকে হাজারো সুবিধা বঞ্চিত কিশোরী।
আজ এই সমাজ সংসার তাকে দিতে পারতো এক গৌরব উজ্জ্বল জীবন, সেও হতে পারতো দেশ ও দশের একজন। মেয়ে হয়ে জন্মিয়েছে বলেই কি এত অবহেলা, কিন্তু কেন…….
…………… সমাপ্ত…………….
[শেষ কথা :একজন মেয়ে হয়েও কিন্তু তিতির আজ হয়ে উঠতে পারতো নিজের দেশের গর্ব দেশের অহংকার তবে পৃথিবীর মানুষের প্রতি তার ঘৃণার জন্য আজ সে হয়ে উঠেছে এমন]

What Our Viewers Say

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Be the first to share your thoughts.